Posts

Showing posts from July, 2023

আকনাদি : পাতাগুলি যেন কথা

আকনাদি : পাতাগুলি যেন কথা ধরা যাক, কোনো বাগানিকে বলা হল—আপনি তো ফুল ও ফলের অনেক গাছ লাগিয়েছেন, পাতার জন্য কোনো গাছ লাগিয়েছেন কি? উত্তর হয়ত আসবে লাগিয়েছি তো, এই ধরেন পাতাবাহার, ফার্ন। —পাতার সৌন্দর্যবাহী কোনো লতা? হ্যাঁ মানিপ্ল্যান্ট, লতাবট। সত্যি বলতে কি, এগুলো সব দীর্ঘদিনচর্চিত ও গৎ-বাঁধা গাছের তালিকা। পাতার সৌন্দর্যের দিকে চেয়ে কেউ যদি বাগান করতে চান তাহলে আমাদের আশেপাশেই রয়েছে অনেক অনেক সুন্দরের হাতছানি। এই যেমন আকনাদির কথাই তোলা যাক। বাগানের জন্য আমরা কেন বেছে নিচ্ছি না রূপের খনি আকনাদিকে? প্রথম দেখায় লতাটি এমনই ভাবে তার সুন্দর পাতাগুলোকে পূর্ণভাবে আপনার সামনে উপস্থাপন করবে যে, ফুল নয় যেন এর পাতাই হবে একেকটি কথা।  আমাদের বসতবাড়ির আশপাশ, পতিত জায়গা, বনতল, জলাভূমির ধার, পথের দুপাশে যখন-তখন দেখতে পাওয়া যায় যে-কয়টি লতা, তার মধ্যে আকনাদি অন্যতম। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের পাছে japonica আছে বলে অনেকে আমরা ভড়কে যাই এই ভেবে যে, লতাটি (Stephania japonica) নিশ্চয়ই জাপানের একান্ত দেশি; আমাদের দেশে হয়ত জাপানের হাত ধরেই সুদূর বা অল্পাতীতে এটি এসে থাকবে—যেরকম এখন আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে, থে

আমাদের ঘেঁটকচু

আমাদের ঘেঁটকচু মোহাম্মদ আলি দেশের এখানে সেখানে, পথে-ঘাটে, ঘাসের দঙ্গলে, অন্যান্য তৃণ-বীরুতের সাথে স্যাঁতসেঁতে কি ভেজা জায়গায় ঘেঁটকচুকে জন্মাতে দেখা যায়। আমাদের দেশের অন্যতম সবজি কচুর মতো অতটা জনপ্রিয় না হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজন মাঠঘাট থেকে এর পাতা, ডাঁটা ও কন্দ যোগাড় করে খেয়ে থাকে। আমি নিজে দেখেছি, ঢাকার নবাবগঞ্জ ও নেত্রকোনার মদনে এর কচি পাতা নারীরা সংগ্রহ করছেন খাওয়ার জন্য। অযত্নসম্ভূত এ নরম বীরুৎটিকে আমাদের দেশে তেমন একটা চাষ করতে দেখা যায় না গেলেও হাটে-বাজারে মাঝে মধ্যে এর দেখা মেলে। দক্ষিণ ভারতে এর কিছুটা চাষ হয় বলে জানা গেছে। ঘেঁটকচুর কচি পাতা ভেজে তার সাথে মরিচ, লবণ ও কালোজিরা দিয়ে বৃহৎ বাংলার কোথাও কোথাও খাওয়া হয়ে থাকে। এর ডাঁটা ঘণ্ট বা ঘেঁট করে খাওয়া হয় বলে এর নাম ঘেঁটকচু হতে পারে বলে এক সূত্র অনুমান করছে। বাঙালমুলুকে বীরুৎটির কয়েকটি আঞ্চলিক নাম রয়েছে; যেমন—ঘেটকোল, ঘাটকোল, খারকোল, খারকেলি, ঘেকুল, খারকুন। বগুড়ায় একে বলে চামঘাস। এটি যে আমাদের সমতল ছাড়া পাহাড়ি বনাঞ্চলেও পাওয়া যায় তার স্মারক হিসেবে রয়েছে আরও কয়েকটি আঞ্চলিক নাম; যেমন—হরবাজ বলে চাকমা সম্প্র

নববর্ষে শঠির বিস্ময়কর উদয়

নববর্ষে শঠির বিস্ময়কর উদয় মোহাম্মদ আলি আচ্ছা, গরমকালে তো অনেক ফুলই ফোটে আমাদের সবুজশ্যামলসজল দেশটায়; ঠিক পহেলা বৈশাখের দিন আমরা কী কী ফুলের দেখা পাব—বলতে পারবেন কেউ? যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ওদিন কাঞ্চনগাছে ফুল পাবই পাব। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যেমন পাব তরুণশুভ্র কাশ, রান্নায় ডালের সাথে থাকবে সুস্বাদু জলপাই। জানুয়ারির প্রথম দিন নিশ্চিত করে পাব সরিষাফুল। আবারো প্রশ্ন—পহেলা বৈশাখে তাহলে কোন ফুল পাব? আমি নিশ্চিত করেই বলছি, শঠি পাবেন এদিন। শঠি ছাড়াও অবশ্য পাবেন পানিপ্রেমী জারুল, হিজল, বরুণ আর মাঠঘাট, গ্রামশহর-কাঁপানো কয়েকটি পরিচিত গাছের ফুল। তবে শঠির কথা আলাদা। সে বনবাণী শুধু নয় ধারণ করে বাঙালিবাণী। উদয় ঘটে তার বনতলে, হঠাৎ করেই। রূপকথার এক অদ্ভুত, বর্ণিল পরি যেন সে!  দশ-এগার বছর আগে এক জ্যেষ্ঠ বন্ধুসহ তিনজন মিলে চলে গেলাম গাজীপুরের চন্দ্রার শালবনে। নির্জনতার একটা আলাদা 'শব্দ' যে পৃথিবীতে আছে তা সেদিন ভালো করে বুঝেছি আমরা তিনজন। আমার আবার চড়কপূজা দেখবার খুব সখ হয়েছিল সেবার। কোথায় গেলে পাব চড়ক, সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ঢাকার কাছেই গাজীপুরের চন্দ্রা, চলে যান। সেখানে পা

ঢাকার প্রাকৃত বৃক্ষ শাল

ঢাকার প্রাকৃত বৃক্ষ শাল মোহাম্মদ আলি মাঝেমধ্যে রাতে যখন ঘুম আসে না, হুটহাট করে মাথা থেকে সারা শরীরে একটা স্বপ্নময় আবেশ ছড়িয়ে পড়ে, মাথার ভেতর জ্বলজ্বল করতে থাকে : ঢাকার অদূরেই তো আছে আমাদের বিশাল বন—শালবন! শালবন! এই যন্ত্রনগরীর উপকণ্ঠেই বনের নিবিড় সবুজ সমাবেশ, মহীরুহ আকার, এর ফুলের গন্ধের অদ্ভুত মাদকতা, এর ফলের ডানা মেলে দূরে উড়ে যাওয়া, এর কাণ্ড বেয়ে ওঠা প্রকাণ্ড সব লতা, নিচে 'ভুঁইফোঁড় রঙিন পরী' শঠিফুল—রূপকথার এক বন যেন! এসব ভেবে ভেবে একসময় ঘুম চলে আসে।  একদিন মনে হল, 'আসা-যাওয়ার পথের ধারে' যে গাছগুলো চোখে পড়ে তাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, বেশ মনোযোগ দিয়ে চিনতে পারি কিনা দেখি। এই ফাঁকে নিজের উদ্ভিদজ্ঞানকেও যাচাই করা যাবে। বড় বড় গাছ, মানে বৃক্ষকে নাহয় সবই চিনলাম, ছোট ছোট উদ্ভিদ—ঘাস, গুল্ম, বীরুৎ, লতা চিনি কিনা, দেখা যাক। বুঝলাম, সব চেনা আমার পক্ষে বেশ কষ্টকর কাজ। অবশ্য অতিউৎসাহী হলে এইসব গাছগাছালির পরিচয় বের করা খুবই সম্ভব। নিজের বইপত্রের সংগ্রহ, ইন্টারনেট, বিশেষ করে ফেসবুকে গাছপালা সনাক্তি গ্রুপগুলোতে (বৃক্ষকথা, বাঙলার গাছগাছড়া) ছবি আর বিবরণী দিয়ে পরিচয়গুলো বের করা যেতে পারে।

দুটি ডিম একটি নীড়ের নাটাকরঞ্জা

দুটি ডিম একটি নীড়ের নাটাকরঞ্জা মোহাম্মদ আলি কক্সবাজারের সৈকতের অদূরে ইনানী সৈকত। মাস অক্টোবর। তিন বন্ধু মিলে ঘুরছি, হইহই করছি,  সমুদ্রস্নান সারছি। এক ফাঁকে দুই বন্ধুকে ফাঁকি দিয়ে দূর থেকে একঝলক-দেখা উস্কোখুস্কো ঝোপঝাড়ের সামনে উদ্ভিদপ্রেমের স্বভাবসুলভ টানে গিয়ে দাঁড়ালাম। গিয়ে দেখি, বাহ! এ তো নাটাকরঞ্জা! বইতে, ইন্টারনেটে 'পাখির বাসায় দুটি ডিমে'র আইকনিক ছবিটার কথা মাথায় চলে আসল ঠিক তখনই। বই বা দৃশ্যমাধ্যমে দেখা এক, আর বাস্তব চর্মচক্ষে দেখা আরেক। ফুলের কোনো চিহ্ন পেলাম না; অসংখ্য ফল দিয়ে সুখমৃত্যুর মুখোমুখি ঝোপগুলো। এ এক দারুণ বিসর্জন।কচিসবুজ রঙের ফলগুলো শুকানোর আগেই মাতৃগাছের এই বিদায়বারতা মনটাকে কিছুটা আচ্ছন্ন করে রাখল। তবে ফলে সতেজ উচ্ছ্বাস দেখে দুর্দান্ত রোমাঞ্চ বোধ করলাম। আরো রোমাঞ্চিত হলাম ফলের ভেতর মায়ের কোলের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা দুই শিশুর নিদ্রালস অবস্থানের কথা চিন্তা করে। ঐ যে বলেছিলাম, পাখির নীড়ে দুটি ডিমের কথা।  ঝিনুক-আকৃতির এবং একই সাথে প্রায় ঝিনুক-আকারের ফলগুলো কণ্টকাকীর্ণ বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। কত যে খোঁচা খেয়েছি ১২-১৫টা ফল ছিঁড়তে গিয়ে, তার কোনো শেষ নেই। এ